ঢাকা, শনিবার   ১৩ জুলাই ২০২৪ ||  আষাঢ় ২৮ ১৪৩১

আমার ভূগোল পাঠ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫:০৪, ২৬ আগস্ট ২০২৩  

আমার ভূগোল পাঠ

আমার ভূগোল পাঠ

পৃথিবী যে ঘোরে সেটা সর্বপ্রথম আমি টের পাই ট্রেনের জানালার পাশে বসে! মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে ক্লাস সেভেনে আমার সবচেয়ে প্রিয় সাবজেক্ট  ছিল ভূগোল। ফখরুজ্জামান স্যার আমাদের ভূগোলের টিচার ছিলেন। দ্বিতীয় বা তৃতীয় ক্লাসেই তিনি একটা kaleidoscope নিয়ে এসেছিলেন। ঘূর্ণায়মান বিচিত্র রঙের খেলা দেখে আমি অবাক। একদিন তিনি ক্যাসেট প্লেয়ারে রেকর্ড করে আনলেন গভীর সমুদ্রের তিমি মাছের গান বা গর্জন। আমি সমুদ্রই দেখিনি কখনো। অথচ তার আগেই আমি দূরের সমুদ্রের তিমি মাছের গান শুনে ফেললাম। মনে আমার আর আনন্দ ধরে না। ক্লাস এইটে ফখরুজ্জামান স্যার আমাদেরকে পড়ালেন পৃথিবী সাড়ে ৬৬ ডিগ্রি কোণে নিজ অক্ষের ওপরে ঘুরে সূর্যের চারপাশে নিজ কক্ষপথের ওপরে আবর্তন করার কারণে পৃথিবীতে ঋতু পরিবর্তন হয়।

প্রায় একই সময়ে আমাদের ধর্মের টিচার সাদিক স্যার তার গবেষণালব্ধ বই ‘পৃথিবী সূর্য দুটোই ঘোরে- আল কোরআনের বাণী’ বই লিখলেন। বইটি  সকল ক্লাসের ক্যাডেটদের মধ্যেই ‘বেস্ট সেলার’ হিসেবে প্রবল সাড়া জাগিয়েছিল।

মজার ব্যাপার হলো পৃথিবী যে ঘোরে তা আমি ছোটবেলা থেকেই জানতাম। আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি তখন আমি আমার আব্বার সাথে ট্রেনে করে বেড়াতে গিয়েছিলাম রংপুর জেলার নীলফামারীতে। এক আত্মীয়ের বাসায়। আমাদের এই আত্মীয়টি যমুনা পাড়ের জামালপুর এলাকার কঠিন জীবন সংগ্রামে টিকতে না পেরে ঘুরতে ঘুরতে রংপুর জেলায় সপরিবারে অভিবাসী হয়েছিলেন। তখন থেকেই আমি দেওয়ানগঞ্জ, বাহাদুরাবাদ, গাইবান্ধা, কাউনিয়া, বোনারপাড়া এবং আরো অনেক স্টেশনের নাম জানি। এ সময়েই ট্রেনের জানালার পাশে বসে আমি দেখেছিলাম ট্রেন লাইনের পাশের জায়গাগুলো দ্রুত পেছনের দিকে চলে যাচ্ছে, আর দূরের দিগন্ত রেখার পাশের গ্রামগুলো ঘূর্ণায়মান হয়ে চক্রাকারে ঘড়ির কাটার মতো অনেক দূর দিয়ে আবার ট্রেনের দিকে এগিয়ে আসছে। ক্লাসে ফখরুজ্জামান স্যারকে আমি পৃথিবীর এই আহ্নিক গতির প্রত্যক্ষ দর্শনের কথা বর্ণনা করতেই তিনি হাসতে হাসতে অস্থির।

ছোটবেলা থেকেই রঙের প্রতি আমি প্রবলভাবে মোহগ্রস্ত। আমাদের বাড়িতে শোবার ঘরের বাঁশের তৈরি সিলিং এর নিচে অনেকগুলো ছাঁটকাপড় জোড়া দিয়ে একটা সামিয়ানা টাঙানো ছিল। আমি যতক্ষণ শুয়ে জেগে থাকতাম ততক্ষণ আমি আমার মাথার ওপরের এই রঙের মেলার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। প্রতিটা রঙকেই আমার কাছে মোহনীয় মনে হতো। ক্লাস এইটে জিওগ্রাফীর মাসুদ হাসান স্যার একদিন জানালেন যে মঙ্গল গ্রহের আকাশের রঙ গোলাপি! আমি মুগ্ধ। আমার কাছে মনে হলো ভূগোলই পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল সাবজেক্ট।

মাসুদ হাসান স্যার আর বজলুর রশিদ স্যার আমাদের ভূগোলের ক্লাস নিতেন। দুজনেই চমৎকার পড়াতেন। মাসুদ হাসান স্যারের কথা অনুযায়ী নিরক্ষীয় অঞ্চলের বৃষ্টির পরে মনে মনে আমরা আমাদের ক্লাসমেট সুলায়মানের বিয়ে খেতে যেতাম। সেখানে সুলায়মান ছিল মিনকোট পরিহিত এক অপরূপ বর।

ফখরুজ্জামান স্যার আহ্নিক গতির কারণে আমাদেরকে ছেড়ে আমেরিকা বা অন্য কোথাও চলে গেলেন। পৃথিবীর এই ঘূর্ণায়মান গতি জড়তার কারণে আমরা তাকে ধারণ করে রাখতে পারলাম না। তার জায়গায় এলেন বজলুর রশিদ স্যার। স্যারের নেতৃত্বে আমরা নিরক্ষীয় অঞ্চল ছাড়াও তুন্দ্রা অঞ্চলে, সাইবেরিয়ার বরফাচ্ছাদিত প্রান্তরে, সাহারা মরুভূমিতে ইবনে বতুতার মতন পদব্রজে ঘুরে বেড়াতাম। বিশাল মহাসমুদ্রের লবনাক্ত স্রোতকে অনুসরণ  করে পৌঁছে যেতাম উত্তর মেরুতে মেরুজ্যোতি দেখতে। অথবা ব্লিজারডের মধ্যে আমরা পৌঁছে যেতাম এস্কিমো অথবা শ্বেত ভল্লুকের দেশে। আমাদের আনন্দময় পরিভ্রমণ কখনোই শেষ হতো না।

এইচএসসির পর আমরা সহপাঠীরা সবাই ছড়িয়ে পড়লাম জীবনের পথে পথে। আমাদের কয়েক সহপাঠী ইতিমধ্যেই পৃথিবীর পথ ছেড়ে ভিন্ন পৃথিবীতে চলে গেছে- শাহীন, লুতফর ও সাহেল। চলে গেছেন আমাদের প্রিয় শিক্ষকদের অনেকেই। এই পথযাত্রায় গতকাল আমাদের প্রিয় শিক্ষক মাসুদ হাসান স্যার যোগ দিয়েছেন।

আমি জানি আমাদের আর কখনই সবাই মিলে আবর্তনের মাধ্যমে আহ্নিক বা বার্ষিক গতি সৃষ্টি করা হবে না। তারপরেও আমরা ছুটে চলব অসীম নক্ষত্র মণ্ডলের ভেতর দিয়ে অনিকেত ধুমকেতু বা উল্কার মতো অনিমেষ কাল।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়