ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৪ অক্টোবর ২০২২ ||  আশ্বিন ১৯ ১৪২৯

ছোটগল্প: প্রকৃতির প্রতারণা

নাহিদা আশরাফী

প্রকাশিত: ১৪:৫০, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

আমি খালাকে সালাম দেবার আগেই খালা স্ব-ইচ্ছায় সালামের জবাব নিয়ে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে পরবর্তী প্রশ্নে চলে গেলো।
-ওয়ালাইকুম আস সালাম। তুই কই রে?

- খালা দই কিনতেছি।
- ভালো করেছিস। আমাদের বাসায় আনবি তো?
- জি খালা। তুমি তো দই পছন্দ করো। তাই...
- শোন কয় কেজি আনবি?
এবার আমি লজ্জায় পড়লাম। আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই খালা বলা শুরু করলো।
- শোন এক কেজি করে পনেরোটা প্যাকেট আনতে পারবি?
- আমি তাব্দা খেলাম। একটা না, দুইটা না এক কেজির পনেরোটা! মানে পনেরো কেজি দই? হে আল্লাহ তুমি আমারে মাসের শেষে এ কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছো? প্রানপণে মনে করার চেষ্টা করলাম নিকটতম সময়ে কোন পাপ করেছি কিনা। উত্তেজনায় চিন্তা দই চাপা পড়লো। খালার আবার ফোন। আতঙ্কে ফোন প্রায় পড়ো পড়ো অবস্থা। তবু না ধরে উপায় নাই।
- তুই কি বেবিট্যাক্সিতে আসবি?
- নাহ। বুড়া ট্যাক্সি খুঁজছি। পনেরো কেজি দই উঠিয়ে বেবিট্যাক্সিকে কেন কষ্ট দিবো। তাই বুড়াট্যাক্সি খুঁজছি। পেলেই উঠে পড়বো। 
এসব অবশ্য মনে মনেই বলা যায়। মুরুব্বিদের সামনে কি আর এসব বলা যায়? কি আর করা। খুব বিনয়ের সাথে বললাম, “জি খালা। দই কেনা হয়েছে। বেবির জন্যে ওয়েট করছি।”
- ওহ। শোন তাহলে আরেকটা কাজ কর।
এত ঠান্ডা আবহাওয়াও আমি দরদর করে ঘামছি। আরও কাজ? আমি খালার কথা শুনবো কি আমার মন তখন পার্সের কোণাকাঞ্চি হাতরে বেড়াচ্ছে অভিজ্ঞ ডুবুরীদের মতন। সিএনজি ভাড়া ছাড়া আর কিছু আছে কিনা কে জানে। খালা মনে হয় দূরে বসেও আমার অবস্থা টের পেয়ে বলে উঠলো।
- শোন, বেশি কিছু না। দুই লিটারের দুইটা সেভেন আপ নিয়া আসিস। সাথে টাকা না থাকলে বাকী রেখে আসিস। দোকানদার তো তোর পরিচিত।
কি বলবো বুঝে উঠতে পারছি না। আমাকে সাত হাত মাটির নিচে ডাউন করে খালা আমার সেভেন আপের ফরমায়েশ করছেন। কি আনন্দ! যাই হোক দোকানীকে বিল বুঝিয়ে দিয়ে সিএনজি তে উঠলাম। নিজেকে পুরাই মফিজা মনে হচ্ছিলো (মফিজের স্ত্রী লিঙ্গ)। সিএনজি ওয়ালাও ঘনঘন লুকিং দিচ্ছে দেখলাম। অই ব্যাটার আর কি দোষ। এত সাজুগুজু করে, চোখে সানগ্লাস দিয়ে দুই হাতে পনেরো কেজি দই আর চার লিটার সেভেন আপ নিয়ে কেউ যদি তার যাত্রী হয় এমন উজবুকরে বারবার ঘুরে দেখার যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ আছে। দেখুক কিন্তু দেখতে গিয়া যদি এক্সিডেন্ট করে? জান নিয়ে ভাবি না কিন্তু এত টাকার দই, সেভেন আপ। 
যাই হোক মোহাম্মদপুর এলাম। এপার্টমেন্ট এর দারোয়ানকে খালা বোধহয় আগেই বলে রেখেছিলেন। ও আমার হাত থেকে দই আর সেভেন আপ নিয়েই ছুট লাগালো।
আমি ভাড়া মিটিয়ে  লিফটের ফোর এ উঠে তৃতীয় দফা ধাক্কা খেলাম। দরজা লক করা। দাওয়াত দিয়ে এত কিছু আনতে বলে দরজায় তালা! মানে কি এসবের? আর দারোয়ান ব্যাটাও বা দই নিয়ে কই গেল? খালাকে ফোন দিলাম, খালা ফোন ধরে না। একবার, দুইবার, তিনবার।...
মহা মুশকিলে পড়লাম। এমন তো হতে পারে না। কি যে এক হেজিপেজি অবস্থায় পড়ি খালাকে নিয়ে। দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি কী করা যায়, এর মধ্যেই দেখি দারোয়ান চাচা লিফট থেকে বেরিয়ে দাঁত বের করে হাসছে, ‘এইখানে খাড়ায়া আছেন ক্যা রে? আয়োজন তো ছাদে। ছাদের উড়পে যান।’ উফ! এই বান্দারে আল্লাহ যে কী দিয়ে বানিয়েছে। সব সময় উলটাপালটা কাজ। ছাদে আয়োজন, আমাকে বলবে তো। গেলাম ছাদে। গিয়ে দেখি দই বিতরণ চলছে। পনের জন পথশিশুকে পনের কেজি দই। আর সেভেন আপ তো আমি ছাদে পৌঁছার আগেই শেষ। আমায় দেখে দাঁত বের করে খালা বললেন, শোন খাবার সব শেষ। চল তুই আর আমি পাশের রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে আসি। তখন কেমন লাগে। রাগে শরীর চিড়বিড় করছে। এ যে কী দিয়ে তৈরি একমাত্র তিনিই জানেন। 
হয়তো ভাবছেন একজন মুরুব্বীকে নিয়ে আমি এমন করে কেন বলছি? দু’একটা  উদহারন দেই, বুঝবেন। 
একদিন সকালে হন্তদন্ত হয়ে ফোন দিলো,
- অই, তুই কই রে?
- খালা, মেয়ের স্কুলে।
- মেয়ের স্কুলে তুই কি করিস?
- আমি কিছু করি না খালা। মেয়েরে নিতে আসছি।
- ওহ। শোন তোর খালু কালকে অফিস ট্যুরে রাজশাহী যাবে। তুই সকাল বেলা চলে আসিস। একা থাকতে আমার ভয় ভয় লাগে।
কি আর করা। খালা আমার নিঃসন্তান। তার অনেক কথাই তাই না রেখে পারি না।
- ঠিক আছে খালা আমি চলে আসবো।
- তাড়াতাড়ি আসিস কিন্তু। কি খাবি বল। কি রান্না করবো?
- খালা বাদ দাও। যা কিছু একটা খেয়ে নিলেই হলো।
- ওকে।
- তাড়াতাড়ি চলে আসিস কিন্তু।
পরদিন সকালে তাড়াহুড়ো করে মা আর বাচ্চাদের জন্যে কিছু একটু রান্না গুছিয়ে ছুটলাম খালার বাসায়। মা ও কাজে বেশ হাত লাগালো তার বোনের চিন্তা করে। যাবার সময় ডায়রি আর কলমটা সাথে নিলাম। যদিও জানি এর কিছুমাত্র ব্যবহার সম্ভব নয়। তবু সাথে না থাকলে ভাবটা এমন হয়, উপন্যাস একটা লিখেই ফেলতাম, স্রেফ ডায়রিটা সাথে নেই বলে একটা পূর্ন দৈর্ঘ্য উপন্যাসের করুণ সমাধি ঘটলো। যাই হোক খালার বাসায় পৌঁছুতেই আমার চক্ষু চড়কগাছ। খালু নিচে দাঁড়িয়ে মাহানন্দে এক মুরগীওয়ালার সাথে মুরগী দরদাম করছেন। হতভম্ব ভাব কাটিয়ে উঠে সালাম দিতেই কয়েক সেকেন্ড লাগলো। সালাম পর্ব সেরে খালুকে জিজ্ঞেস করলাম, 
- খালু, আপনার না রাজশাহী যাবার কথা অফিসিয়াল কাজে?
- হ্যা রে মা। কিন্তু সে তো রাতের ট্রেনে। এখন কেন? তা তুই কি মনে করে? 
আমি হা হয়ে গেলাম। কিছুতেই খালুকে বলা যাবে না খালা আসতে বলেছে। কারন খালু না থাকলে খালা যে বাড়িতে একা একা ভয় পায় এ তথ্য সে কোনভাবেই খালুকে জানাতে নারাজ। অতএব যে কোন ভাবে আমাকে কথা এড়িয়ে যেতে হবে। তাই কথা এড়াতে হরবর করে বললাম, “তেমন কিছু না খালু এই এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম খালাকে দেখে যাই।” খালু মুচকি হাসলেন। হাসিতেই বুঝিয়ে দিলেন যা বোঝানোর। এদিক দিয়ে যাবার কোন কারণ যে আমার নেই এবং এদিকে আমি আসি স্রেফ খালার বাসায় তা আমি কেন আমার বাসার পোষা ময়নাটাও জানে। নিজের উপর নিজেরই রাগ হলো। আরে বাবা একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলতে শেখো। শেষমেশ খালুই বাঁচালেন আমায়। “যা রে মা। তোর খালা ঘরেই আছে।” উফ! যেন ঘাড় থেকে এক মন ওজনের বোঝা নামলো। কোন রকম খালুর সামনে থেকে পালিয়ে বাচঁলাম।... 
- আচ্ছা খালা তুমি এমন কেন?
- ওমা! তুই এত সকালে আসছিস কেন? 
- উলটা ঝাড়ি দিও না তো। তুমিই না বলছো সকাল সকাল চলে আসতে। তখন তো বললা, পারলে আটটার আগে আয়।
- হ্যা সে তো রাত আটটার আগে। সকাল আটটার আগে বলছি নাকি? তোর খালুর ছ’টা বিশ এ ট্রেন। তাই ভাবলাম সাড়েসাতটা আটটার দিকে এলে তোকে নিয়ে একটু বেরুতাম।
- খালা তুমি স্পষ্ট বলছো সকাল আটটার কথা। বিশ্বাস না হয় তোমার বড় বোনকে জিজ্ঞেস করো।
বড় বোনের কথা বলায় একটু দমে গেল খালা। এই একটা জায়গায় সে ধরা খেয়ে যায়। তার বড় বোনের কথাকে সে বেদবাক্য মনে করে।
- ওহ! তাই বলেছি বুঝি? তবে তো ম্যালা ক্যাচাল হয়ে গেল।
- উফ খালা তুমি যে কি করো না। আমি আরও কি তাড়াহুড়ো করলাম।
- আচ্ছা বাদ দে না। এখন কি করা যায় বলতো?
এরই মধ্যে খালু গোটা বারো ড্রেসিং করা মোরগ নিয়ে বাসায় ঢুকলেন। খালুকে দেখে খালা আরও অপ্রস্তুত। 
- মীনা
- হ্যা বলো। এই তো আছি। এত চেঁচাচ্ছ কেন?
খালু হাঁ হয়ে গেলেন। 
- চেঁচাচ্ছি! কে আমি? কই চেচালাম?
এত কষ্টেও আমার হাসি পেল। খালা নিজের অপ্রস্তুত ভাব কাটাতে উল্টো খালুকেই খমকাচ্ছেন।
- আচ্ছা কি হয়েছে বলো।
- কিছুই হয় নাই। মুরগীগুলো ফ্রিজিং করো আর মেয়েটাকে কিছু খেতে দাও। বসে বসে তো গল্পই করে যাছো।
- হ্যা দিচ্ছি। ও এখুনি চলে যাবে। একটা কাজের জন্যে এসেছিলো। 
খালার কথায় আমি পুরা না হলেও আধা পাথর হয়ে গেলাম। বলে কি? আমি কই যাবো? খালা আমার দিকে তাকিয়ে চোখ ইশারা করলেন। 
- ভালোই হয়েছে। কাজেই হোক আর যাই হোক এসেছে তো। আজ আর যেতে দিও না। এক কাজ করো দুটো মুরগী দিয়ে বিরানি রান্না করে ফেলো। দুপুরে মা ছেলে একসাথে খাই।
খালুর এ কথা শুনে খালার মুখ শুকিয়ে গেছে। তার জন্যে পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্টের কাজ হলো রান্না করা। সকাল দশটা থেকে দুপুর বারোটা এই সময়টা পারলে সে দিনের শরীর থেকে ঘষে মুছে উঠিয়ে ফেলতো। কারন এই সময়টুকু তার রান্না ঘরে থাকতে হয়। 
- আর হ্যা শোন ঘরে আমড়া আছে না? 
আমড়ার কোরমা করে ফেল। মোরগ পোলাউ সাথে আমড়ার কোরমা। আহ! যা জমবে না।
এই অবস্থায় খালা নির্ঘাত কেঁদে ফেলবে। যে কোন ভাবেই হোক খালাকে উদ্ধার করতে হবে। কি বলি। আর এমন ইমার্জেন্সি সিচুয়েশনে মাথা কাজ করে না। তাই তড়িঘড়ি করে বললাম, “না না খালু আমাকে তো এখুনি ফিরতে হবে। বাসায় অনেক কাজ ফেলে এসেছি।”
খালা অথই জলে ক‚ল পেলেন মনে হলো।
- হ্যা বললাম না। ওকে এখুনি ফিরতে হবে। আর তাছাড়া তুমি সন্ধ্যায় ট্রেনে উঠবে। দুপুরে এত রিচ ফুড খাওয়া ঠিক না। তুমি বরং যাও ওকে একটা সিএন্ডজি করে দাও।
খালু আমার সাথে বড় রাস্তা পর্যন্ত এলেন। একটা ক্যাব থামিয়ে আমাকে তুলে দিলেন। ক্যাবে ওঠার ঠিক আগ মূহুর্তে বলে উঠলেন,
- সরি মা।
- ওমা সেকি। কেন সরি বলছেন খালু?
- আমি সবই বুঝি রে মা। তুই যে আজ রাতে তোর খালার সাথে থাকতে এসেছিস, আমি বাসায় না থাকলে যে সে একা থাকতে পারে না তা আমি ভালো করেই জানি। কিন্তু ওটা তোর খালার সামনে বললে সে লজ্জা পাবে। দেখতো ভুল করে রাত আটটার ট্রেন সকাল আটটায় বললো সে আর বিড়ম্বনা ভোগ করলি তুই। এ জন্যেই খাবার কথা বলে তোকে আটকাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বলেই বুঝেছি তাকে আরও বিপদে ফেলেছি। কারন রান্না করা তার কাছে শাস্তির সমান। মা রে তোর খালা এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবীদের একজন। তুই তো সবই জানিস। অনেক না বলা কষ্ট সে ভুলে থাকতে চায় এইসব ছেলেমানুষি দিয়ে।
এই ধরনের আবেগধর্মী পরিবেশে আমি কিছুটা “কি করিব কি করিব না” টাইপ সিচুয়েশনে পড়ি। যা বলতে চাই সেই সব শব্দ বাক্য গলার কাছে এমন ভাবে দলা পাকায় যে মনে হয় কেউ কোন কাগজের দলা বাইরে ছুড়ে ফেলতে গিয়ে ভুল করে আমার গলার মধ্যে ছুড়ে দিয়েছে। কোন রকম পালিয়ে বাঁচলাম খালুর সামনে থেকে।...
বেশকিছুদিন পরে আবার খালার ফোন।
- ফ্রি আছিস?
- না থাকলে হবো। বলো কি কাজ।
- না কাজ কিছু না। আগামী মাসে আমার বান্ধবীর মেয়ের বিয়ে।
- তাই?
- হ্যাঁ। বিয়ের জন্যে একটা ভালো শাড়ি কিনতে চাচ্ছিলাম। তোকে ছাড়া তো শাড়ি কিনি না কখনও। তাই ভাবলাম তোকে নিয়েই যাই।
- ঠিক আছে খালা। কই যাবা শাড়ি কিনতে? আই মিন কোন এড়িয়াতে। জানলে সেইভাবে টাইম ফিক্সড করবো।
- সেদিন গুলশান আড়ং এ দারুণ একটা শাড়ি দেখেছি রে। তোর পছন্দ হলে ওটাই ফাইনাল করবো।
- হুম। তার মানে গুলশান যেতে হবে। ওকে খালা আজ না। তাহলে কাল যাই?
পরদিন খালার সাথে আড়ং এ গেলাম। খালার মনোনীত শাড়ি আমারো পছন্দ হলো। শাড়ি কাউন্টারে দিয়ে খালা এটা সেটা দেখছেন। আমিও বেহুদাই ঘুরঘুর করছি। পনেরো বিশ মিনিট পার হবার পর পছন্দনীয় কিছু খুঁজে না পেয়ে খালাকে খুঁজতে লাগলাম। অহেতুক ঘোরাঘুরি না করে বাসায় ফেরা যাক। এ কর্নার সে কর্নার কোথাও নেই খালা। আরে! গেল কোথায় বান্দা। গেলাম ফুড জোনে। সেখানেও নেই। আমার মাথা ঘুরতে শুরু করলো। মোবাইল বের করে ফোন দিলাম খালার মোবাইলে। ওপ্রান্ত থেকে ফোন রিসিভের আওয়াজ শুনে স্বস্তি পেলাম। কিন্তু আমার স্বস্তি যে কোন সমাধান ডেকে আনবে না তা কি তখনও বুঝেছি? 
- হ্যালু কেডা?
- কিরে হাসান তুই ফোন ধরলি ক্যান?
- আম্মায় ফোন বাইত্তে থুইয়া গেছে মনের ভুলে।
এই হাসান আমার খালার সর্বশেষ সংযোজন। এর আগেও নামঠিকানা ও পরিচয়হীন তিনজনকে এনেছিলো বাড়িতে। তারা তিনজনই যথাক্রমে যে যা পেরেছে চুরি করে পালিয়েছে। তবু খালার এই কাজে কোন ক্লান্তি নেই। যাই হোক এখন খালাকে খুঁজে বের করাই আমার প্রধান কাজ। তাকে ফোনেও না পেয়ে আমি হতাশার শেষ প্রান্তে পৌঁছুলাম। এখন কি হবে? ওদিকে কাউন্টারে শাড়ি রাখা। এদিকে খালাকে খুঁজে পাচ্ছি না। কিন্তু কিছুতেই মাথায় আসছে না, যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগেও আমার সাথে ছিলো সামান্য বিচ্ছিন্নতায় সে এভাবে উধাও হয়ে যায় কিভাবে? উদ্বেগে আমার গলা শুকিয়ে গেল। হাত পা কাঁপতে লাগলো। কোন এক্সিডেন্ট বা অন্য কোন দূর্ঘটনা। নাহ আর নিতে পারলাম না। এভাবে চুপচাপ বসে থাকা যাবে না। খালার বর্ণনা দিয়ে বেশ কয়েকজন সেলস গার্লকে জিজ্ঞেস করলাম। একজন বল্লো, সে এরকমের একজনকে দরজা গলিয়ে রাস্তা পেড়িয়ে ওপাশে যেতে দেখেছে। আমার তখন শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে। খালুকে ফোন দিলাম। এক ঘন্টার মধ্যে খালু আড়ং এ এলেন। এই এক ঘন্টা আমি কি রকম মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেছি তা বিধাতা ছাড়া কে জানবে। ব্যাপারটা এমন নয় যে খালু এসেই আমায় আশংকামুক্ত করেছেন। তাকে পেয়ে অন্তত উৎকণ্ঠা শেয়ার করার আরেকজনকে পেলাম। ভাবা যায় একটা মানুষ এভাবে উধাও হয়ে যেতে পারে!
- মা রে আমাদের এখন এখানে দাঁড়িয়ে থেকে কোন লাভ নেই। হয় বাসায় গিয়ে অপেক্ষা করি নয় তো থানায় যেতে হবে।
- সেই ভালো। চলেন থানায় যাই।
- না রে মা। থানায় যাবার আগে আমি আরও কিছুটা সময় দেখতে চাই। চল বাসাতেই যাই।
বাসায় ফিরে আরেক চিত্র। আত্মীয় পরিজন অনেকেই ইতোমধ্যে খালার নিখোঁজ সংবাদ পেয়ে গেছেন। একেকজনকে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি ক্লান্ত। কারো প্রশ্নের ধরণ শার্লক হোমসের মতন। ভাবখানা এদের এমন যেন খালাকে আমিই গুম করেছি।
কারো বা জিজ্ঞাসা পুলিশ বাহিনীর মতন। মানে খুন তো করেছিই, লাশটা কোথায় রেখেছি সেটাই বিষয়। আর কারোর আবার পুরাই সাংবাদিক স্টাইল; ‘আমার কাছে সত্যটা বলেন। আমি কাউকেই বলবো না।’
তবে সব বিস্ময়ের যিবনিকাপাত করে খালা আমার গুনে গুনে পাঁচ ঘন্টা বায়ান্ন মিনিট পরে নিজ দায়িত্বে ফিরে এলেন। মানুষ যে অধিক শোকে পাথর হয় এই বাগধারার সার্থক রুপায়ন দেখলাম। আমি আর খালু অধিক উদ্বগে গ্রানাইট হয়ে গেলাম। আমরা কিছুই জিজ্ঞেস করলাম না খালাকে। খালাও চুপ। তবে সিনেমার দর্শকরা একটু হতাশই হলো মনে হয়। এত তাড়াতাড়ি এই সিনেমার যবনিকা ঠিক মানতে পারছিলো না। আরে বাবা কোথায় ঝনঝন করে মোবাইল বেজে উঠবে, কেউ একজন ওপাশ থেকে হু হা হা করে ভিলেনের মত বলবে ‘আজ সন্ধ্যের মধ্যে তিরিশ লাখ টাকা না দিলে তোর স্ত্রীকে মেরে কেটে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেবো’ তবেই না সিনেমা জমতো। নিদেনপক্ষে এক অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসতো, “হ্যালো জাফর সাহেব বলছেন? কিছুক্ষণ আগে একটা রোড এক্সিডেন্ট হয়েছে। ভদ্রমহিলার ভ্যানিটিব্যাগে আপনার নাম্বার পাওয়া গেছে। আপনি কি চেনেন ওনাকে?” এসব না হলে কি আর হলো? ধুর দর্শকদের হতাশ করে এভাবে ফিরে আসাটা ঠিক জমলো না। 
- খালু, আমি না হয় এখন যাই। বাসায় বাচ্চারা একা।
- হ্যা রে মা। এত সব টেনশনে তো ভুলেই গিয়েছিলাম তোর বাসার কথা।
- খালু একটা কথা...
- হ্যা রে মা, বল
- ইয়ে মানে খালু... এখনই খালাকে কিছু বলবার দরকার নেই। একটু সুস্থির হোক, তারপর না হয়...
- আমি বুঝতে পেরেছি মা। তুই ভাবিস না। তুই হয়তো ভাবছিস আমার মেজাজ খারাপ। না, মোটেই না। ওর স্বভাবগত হেয়ালিপনা তো আমি জানি রে। স্থির হলে নিজেই বলবে। আর স্রেফ এ কারণেই আমি তখন থানায় যাইনি। তুই যা রে মা। আর বড় আপা থাক ওর কাছে। আপাকে কাল আমি দিয়ে আসবো। 
- জি খালু।
আমি রওনা দিতে যাবো ঠিক এমন সময় আমাদের চমকে দিয়ে খালা ড্রইংরুমে এসে দাঁড়ালেন। চুপচাপ কোণের চেয়ারটায় বসলেন। ঋজু ভঙ্গিতে বসাটার মধ্যে কী যেন ছিলো। বুকের ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠলো। মনে হল এক মুহূর্তে জড়িয়ে ধরে বলি, “খালা কাউকে কোন কৈফিয়ত দিতে হবে না। তোমার যা ইচ্ছে হয়েছে করেছো। এখন স্বাভাবিক হও তো। খালুর সাথে রাগারাগি করো, আমাকে হুটহাট পাগলামির জন্যে ডেকে আনো, বাসায় একটার পর একটা অজানা অচেনা গৃহকর্মী রাখো, তারা তোমার টাকাপয়সা নিয়ে ভেগে যাক। তবু তুমি স্বাভাবিক হও। তোমাকে এমন মানায় না। কিছুই বলা হয় না। শুধু চোখটা ঝাপসা হয়। খালার কণ্ঠ শুনে চমকে উঠি।  
- আমি জানি জাফর, আমায় নিয়ে তুমি অনেক রকম বিপদে পড়ো। অনেক রকম মানসিক দুশ্চিন্তায় রাখি তোমাকে। অনেক উল্টোপাল্টা কাজে পেঁচিয়ে ফেলে আবার নিজেই সব দায় তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেই। যখন একলা থাকি, তখন এসব কাজের জন্য অনুতপ্ত হই, নিজের উপর রাগ হয়। কিন্তু কি করবো বলো, কেন যেন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ি মাঝে মাঝে। সংসারটা চাকার মত। চলতে চলতে ক্ষয় হয়। হাওয়া কমে আসে। তাকে হাওয়া দিতে হয়। তখন সে আবার নতুন উদ্যোমে চলতে শুরু করে। আমার জীবনে কোন হাওয়া নেই। এমন কি তোমাকেও সেই হাওয়া থেকে আমি বঞ্চিত করেছি। একটা সন্তান তোমায় দিতে পারিনি এই আক্ষেপ কষ্ট আর নিজের মধ্যকার হাহাকার সব ঢাকতে গিয়ে আরো যেন নিজেকে উন্মুক্ত করে ফেলি। কাল যখন কেনাকাটা করছিলাম আমার পয়ত্রিশ বছরের পুরনো বান্ধবী শীলার সাথে দেখা হল আড়ং এর সামনে। ও জানালো হাসপাতালে যাচ্ছে ওর ছোটবোনের ডেলিভারি হবে। কী যে ভর করল আমার মাথায়। ওকে দুম করে বলে বসলাম আমিও যাব। ও কিছুটা অবাক হয়েছিল তবু না করলো না। আমি মুহূর্তেই ভুলে গেলাম কেয়ার কথা। ওকে যে দোকানে দাঁড় করিয়ে রেখে এসেছি ও যে শাড়িটা নিয়ে অপেক্ষা করছে কোন কিছু মনেই রইলো না। আমার চোখে তখন শিলার ছোট বোন যাকে আমি কোনদিন দেখিইনি তার স্ফীত উদর আর তৃপ্তি মাখা গর্বিত মুখখানি। হাসপাতালের লেবার রুমে পেশেন্ট হিসেবে আমার হয়তো কোনদিনই যাওয়া হবে না। তাই ওর বোনের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শুধু এক অপূর্ণ অনুভব নিতে চেয়েছিলাম। কি হ্যাংলার মতো আমি তাকিয়েছিলাম ওর বোনের একটা স্বর্গের শিশু ধারণ করা পেটটার দিকে। চারদিকের স্যাভলন, ওডিকোলন আরো নানা রকম ওষুধের গন্ধকে আমার ফুলের গন্ধের চেয়েও মিষ্টি লাগছিলো। ওর বোনকে যখন স্ট্রেচারে শুইয়ে লেবার রুমে নিয়ে গেল, মনে হল আমিও সাথে গেলাম। এভাবে কতক্ষণ ছিলাম জানি না। সম্বিত ফিরলো এক স্বর্গ শিশুর কান্নার সুরে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি এত মধুর সুর আজ অবধি পৃথিবীর কোন সুরকারই বাঁধতে পারেনি। শীলা শিশুটিকে আমার কোলে দিল। মিথ্যে বলব না একবার কি মনে হয়েছে জানো শিশুটিকে নিয়ে আমি পালিয়ে যাই পৃথিবীর নিভৃততম কোন স্থানে। কতোক্ষণ বাচ্চাটা বুকে চেপে ছিলাম জানি না। পরে শীলা ওর গাড়িতে আমায় বাড়ি পৌঁছে দিলো।  
চারটি প্রাণ নিজেদের স্পন্দন ছাড়া আর কোন শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছিলাম না। চোখের জল ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলে বুঝলাম যতই শক্ত থাকার অভিনয় করি না কেন চোখ ঠিক প্রতারণা করে বসে আছে। আমি খালার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই খালা হাউমাউ করে কেঁদে আমায় জড়িয়ে ধরে বললো, “তোরা আমায় ক্ষমা করে দিস রে মা। ক্ষমা করে দিস।” 

আমি শক্ত করে খালার মুখটা তুলে ধরলাম। বুক ভেঙে গেলেও স্পষ্ট ভাষায় বললাম, “খালা তুমি কোন অন্যায় করোনি যে ক্ষমা চাইবে। যে খামখেয়ালি প্রকৃতি তোমার প্রতি অবিচার করেছে, ক্ষমা তো সে চাইবে তোমার কাছে।” 
এরই মাঝে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে খালু আর আমার মা। খালাকে আমি ধমকেই যাচ্ছি, “তুমি কাঁদবে না, একদম না।” অথচ আমরা সবাই কেঁদে চলেছি এক অনন্ত অভিমানে।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়