ঢাকা, রোববার   ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ||  মাঘ ২২ ১৪২৯

জিয়া ও মোশতাক ষড়যন্ত্রের আমলনামা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯:৫৫, ২৫ জানুয়ারি ২০২৩  

জিয়া ও মোশতাক ষড়যন্ত্রের আমলনামা

জিয়া ও মোশতাক ষড়যন্ত্রের আমলনামা

ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে অপরাধীদের বিচার থেকে দায়মুক্তি দেয়ার এ ধরনের নজির ইতিহাসের কোথাও পাওয়া যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গোপন দলিলসমূহ উন্মুক্ত হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধকালীন বহু অজানা তথ্য আমাদের গোচরে এসেছে। আগে যা ছিল নেহায়েত কল্পনাপ্রসূত, তার অনেকগুলোই সত্য বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে উন্মোচিত নথিসমূহ থেকে।

খন্দকার মোশতাক এবং জিয়াউর রহমান যে মুক্তিযোদ্ধার মুখোশ পরে আসলে আমাদের স্বাধীনতাবিরোধী হিসাবে কাজ করেছে সে কথা এখন প্রমাণিত সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। শুধু জিয়া-মোশতাকই নয়, আরও বহু পাকিস্তানি চর তখন মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে ভারতে গিয়েছিল– যাদের মধ্যে খুনি ফারুক-রশীদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১-এর ৯ অগাস্ট ভারত-সোভিয়েত বন্ধুত্ব চুক্তি পাকিস্তান, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাথা খারাপ করে দেয়।

কিসিঞ্জার একে বম্ব শেল বলে আখ্যায়িত করেন। আগে এরা ধরে নিয়েছিল চীন উত্তর দিক থেকে এবং মার্কিন সেনারা দক্ষিণ থেকে এসে পাকিস্তানের পক্ষে লড়ে পাকিস্তানকে উদ্ধার করবে। কিন্তু ভারত-সোভিয়েত চুক্তি তাদের সেই অভিলাষ চুর্ণ করে দিলে, পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র-চীনের ষড়যন্ত্র আরও বেগবান করা হয়। ওই ষড়যন্ত্রের সঙ্গী খুঁজতে এদের কোনো সমস্যা হয়নি, কেননা মোশতাক-জিয়া গং এর জন্য তৈরিই ছিল।

জিয়ার ষড়যন্ত্র ১৯৭১-এর জুলাই মাসেই সকলের নজরে আসে। ১২-১৭ জুলাই কোলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে মুজিবনগর ভিত্তিক বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন সাহেবের নেতৃত্বে বাংলাদেশি ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। কর্নেল ওসমানী সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন না। ওই সভায় মেজর (সে সময়ের) জিয়া একটি ধ্বংসাত্মক প্রস্তাব সমর্থনে বক্তব্য রাখেন, যেটি ছিল মুজিবনগর ভিত্তিক বাংলাদেশ সরকারের স্থলে একটি যুদ্ধকালীন কাউন্সিল গঠন করা।

এই কূট চক্রান্তমূলক প্রস্তাব কর্ণেল (সে সময়ে) ওসমানীর নিকট পেশ করা হলে তিনি এতই রাগান্বিত হয়েছিলেন যে সঙ্গে সঙ্গেই মুজিবনগর ভিত্তিক সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন, যদিও পরে সকলের অনুরোধে তিনি আবার স্বপদে ফিরে গিয়েছিলেন। তার ক্রোধের কারণ ছিল তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন জিয়া সমর্থিত ওই প্রস্তাবটি ছিল একটি ষড়যন্ত্রেরই অংশ, মুজিবনগর ভিত্তিক সরকারকে হেয় করার জন্য।

জিয়ার সমর্থিত ওই প্রস্তাবকে অনেক বোদ্ধারাই তখন পাকিস্তান প্ররোচিত বলেই মনে করেছিলেন, কেননা পূর্ব বাংলার গণমানুষের ভোটে জয়ী গণপরিষদ সদস্যরাই উক্ত সরকার গঠন করে সারা বিশ্বের কাছে দাবি উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন যে এটাই বাংলাদেশের গণমানুষের নির্বাচিত সরকার, আর এই সরকারকে হেয়-প্রতিপন্ন করা গেলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সমর্থন হারাবে এবং একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের গতি পাকিস্তানি পরিকল্পনামাফিক জিয়া-মোশতাকের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে ধুলিস্যাত করবে। তবে সকলের সতর্কতার কারণে ওই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি দেখেই মুক্তিযুদ্ধ রক্ষা পেয়েছিল। জিয়া সমর্থিত ওই প্রস্তাব এবং এর প্রতিক্রিয়ায় কর্নেল ওসমানীর পদত্যাগের কথা ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার আর পি সিংয়ের গবেষণাধর্মী পুস্তক ‘ফ্রম ইস্ট পাকিস্তান টু বাংলাদেশ’-এ আলোচিত হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার আর পি সিং ভারতীয় সেনাবাহিনীর হয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরুর পর থেকেই ইয়াহিয়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝোলানোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছিলেন। ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার জন্য প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সমাপ্ত করে ১৯৭১-এর ১১ অগাস্ট ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে শুধু রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলার ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি এক ব্রিগেডিয়ারের নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনালের গঠনেরও ঘোষণা করেন। তখনই যুক্তরাষ্ট্রের বহু প্রভাবশালী রাজনীতিক, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আন্তর্জাতিক জুরিস্ট কমিশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সোচ্চার হলেও ইয়াহিয়াকে রোধ করতে পারেননি।

ইয়াহিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র বরং মিলেঝিলে এক নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বোনে মোশতাক, মাহবুব আলম চাষী, কাজী জহুরুল কাইয়ুম প্রমুখ তথাকথিত আওয়ামী লীগ নেতাদের সমন্বয়ে, যারা আসলে ছিল ঘাপটি মারা পাকিস্তানি চর। একজন সামরিক ব্যক্তি হিসেবে তাদের দলে মিলানো হয়েছিল ওই সময়ের মেজর জিয়াউর রহমানকে। যার বেড়ে ওঠা পাকিস্তানে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা শাখায় কাজের জন্য। অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার কিছু আগে পাকিস্তানি কর্তাদের নির্দেশে মেজর জিয়া সোয়াত নামক পাকিস্তানি জাহাজ থেকে পাকিস্তান থেকে পাঠানো সমরাস্ত্র খালাস করতে গিয়েছিলেন– এমনই একটি সময়ে যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালি সৈন্যরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন। তাকে এই ষড়যন্ত্রের জন্য বেছে নিতে পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের কষ্ট হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জিয়াউর রহমান প্রকাশ্যে মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরোধিতা করায় সে যে আসলে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তা সবার নজরে চলে আসে, আর তাই তাকে নিরাপদে বেছে নিয়েছিল পাকিস্তান-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রকারীরা। ওই সময় বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন মোশতাক। শুরু থেকেই যে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধী ছিলেন, তা ভারতীয় এবং বিদেশি গোয়েন্দাদের কাছে অজানা থাকেনি। তিনি এবং তার অনুচররা সর্বদাই ভারতীয় গোয়েন্দাদের পর্যবেক্ষণে ছিলেন। ভারত সরকার বিষয়টি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছিলেন। যার প্রেক্ষিতে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের অধিবেশনে মোশতাককে না পাঠিয়ে তার পরিবর্তে আব্দুস সামাদ আজাদ সাহেবকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল (তবে সবশেষে বাংলাদেশ দলের নেতা হিসাবে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সাহেবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল)।

সিআইএ’র দলিলে মোশতাককে একজন চরম ডানপন্থী এবং অতি উচ্চাভিলাষী বলে চিহ্নিত করা হয়। তাদের জানা মতে মোশতাক ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদকে হত্যার পরিকল্পনাও করেছিলেন, তবে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা তা জেনে যাওয়ায় মোশতাকের ওই ষড়যন্ত্র ভেস্তে যায়। যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তান উভয় সরকারই মোশতাক এবং তার অন্যান্য ঘনিষ্ঠদের সাথে সব সময়ই যোগাযোগ রাখছিল। অন্য যে ব্যক্তিকে পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র ষড়যন্ত্রে সাথী করেছিল, তার নাম কাজী জহুরুল কাইয়ুম, আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত হলেও মোশতাকের মতো যিনি ছিলেন পাকিস্তান ভাঙ্গার চরম বিরোধী।

তিনি মোশতাকের পক্ষ হয়ে কোলকাতায় অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেটের দফতরে গমন করে পাকিস্তানের সাথে সম্মিলনির এক ফরমুলা পেশ করেন, যাতে বাংলাদেশ-পাকিস্তান কনফেডারেশনের নীল নকশা ছিল। ওই সময়ে মোশতাক-জহুরুল কাইয়ুম-মাহবুব আলম চাষী গংদের সাথে আলোচনা চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জর্জ গ্রিফিত নামক কনস্যুলেটের প্রধান কর্মকর্তাকে। অগাস্ট মাসেই পাকিস্তানে কর্মরত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড সাহেব ইয়াহিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে মোশতাক-জহুরুল কাইয়ুম গংয়ের সাথে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সাক্ষাৎ এবং সাফল্যের ফিরিস্তি প্রদান করেন। ইয়াহিয়া একথা শুনে উল্লাসে ফেটে পড়েন।

কিসিঞ্জার এ ব্যাপারে বলেছিলেন, “এটি ছিল একটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের রাষ্ট্রপতিকে প্রদান করা এক অভূতপূর্ব সংবাদ।” ১৯৭১-এর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন কনস্যুলেট জহুরুল কাইয়ুমকে জানায় যে, ইয়াহিয়া মোশতাকের সাথে গোপন আলোচনা চালাতে সম্মত হয়েছেন। জহুরুল কাইয়ুম মার্কিন কনস্যুলেট কর্মকর্তা গ্রিফিতকে জানান তিনি মোশতাকের সাথে আলোচনার পর দিন, তারিখ এবং বৈঠকের স্থান জানাবেন। কিন্তু সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গ্রিফিত জহুরুল কাইয়ুমকে জানান তাদের এই ষড়যন্ত্রের কথা ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে ধরা পড়ায়, তার পক্ষে এতে অংশ নেওয়া বিপজ্জনক হবে। তিনি বলেন মোশতাক গংদের পাকিস্তানপন্থী মনোভাব পুরোটাই ভারতীয় গোয়েন্দারা জেনে ফেলেছেন।

২১ সেপ্টেম্বর ইয়াহিয়া পাকিস্তানে কর্মরত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে ওই গোপন আলোচনার কথা জিজ্ঞেস করলে রাষ্ট্রদূত সযত্নে জবাব এড়িয়ে যান। ২৩ সেপ্টেম্বর জহুরুল কাইয়ুম মার্কিন কনস্যুলেটকে জানান ভারত সরকার এক ফরমানের মাধ্যমে সকল বিদেশিকে প্রত্যক্ষভাবে ভারত সরকারের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলেছে।

এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এল কে ঝা-কে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সাথে সরাসরি আলোচনার ব্যবস্থা করতে বললে এল কে ঝা দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলেন এর জন্য প্রথমেই বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিয়ে তার সাথেই আলোচনা চালাতে হবে। ২৮ সেপ্টেম্বর কোলকাতাস্থ মার্কিন কনসালের অফিস জানায় মোশতাক গংদের সাথে তাদের গোপন বৈঠকের বিষয় ভারতীয় গোয়েন্দাদের নজরে চলে আসায় এখন সব কিছু চরম গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে করতে হবে। ১৬ অক্টোবর জহুরুল কাইয়ুম বলেন মোশতাকের সাথে আর কোনো বৈঠক সম্ভব নয়। কিসিঞ্জার বলেন অক্টোবরের শেষনাগাদ মোশতাক গংদের সাথে আলোচনার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে মোশতাক গংদের সাথে পাক-মার্কিন গোপন বৈঠকের কথা চাউর হয়ে যায়।

মার্কিন কনস্যুলার অফিস এবং মোশতাকের মধ্যে ৮টি বৈঠক হয়, যার একটিতে স্বয়ং কিসিঞ্জারও টেলিফোনে কথা বলেন। এই খবর জানাজানির পর সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ দলের নেতা হিসাবে মোশতাককে না পাঠিয়ে আব্দুস সামাদ আজাদ সাহেবকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে নেতৃত্ব দেওয়া হয় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সাহেবকে। মনে করা হয়েছিল মোশতাক পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের একীভূত হওয়ার প্রস্তাব জাতিসংঘে উত্থাপনের পায়তারায় ব্যস্ত, যা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো।

৪ অগাস্ট লন্ডনের দৈনিক টেলিগ্রাফ পত্রিকার স্বনামধন্য প্রতিনিধি ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ মার্কিন কর্মকর্তা এবং মোশতাকের গোপন বৈঠকের বিবরণী প্রকাশ করলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নজরে চলে আসে। এই প্রতিবেদন দ্বারা আরও প্রমাণ করা হয় চরম গোপনীয়তা সত্ত্বেও এই বৈঠকসমূহের কথা অজানা থাকেনি। এদিকে জেনারেল ফরমান আলী মনে করেন মার্কিন প্রতিনিধি এবং মোশতাকের বৈঠক সফল হলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ইয়াহিয়াকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে বলে ইয়াহিয়া ভীত হয়ে পড়ে এবং তাই তড়িঘড়ি করে বঙ্গবন্ধুর বিচার শুরু করে দেয়, ঠিক ওই সময়েই যখন মার্কিন প্রতিনিধিদের সাথে মোশতাক গংদের বৈঠক চলমান ছিল। অন্যদিকে ইয়াহিয়া কিসিঞ্জারের ওপর চাপ প্রয়োগ করছিল আমেরিকার মধ্যস্থতায় মোশতাক গংদের সাথে আলোচনায় ইয়াহিয়াকে রাখতে, যাতে তার গদি নিরাপদ থাকে।

কিন্তু কিসিঞ্জার বেশি দূর এগুতে পারেননি কেননা ডি পি ধর তাজউদ্দিন সাহেবকে মোশতাকের কূট পরিকল্পনা ফাঁস করে দেন, এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রীত্ব থেকে মোশতাককে অপসারণ করে আব্দুস সামাদ আজাদকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করার পরামর্শ দেন। তাজউদ্দিন আহমদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে মোশতাকের অপসারণের প্রস্তাবে এই বলে এক হতে পারেননি যে তা করলে মনে করা হবে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যেই কোন্দল রয়েছে।

তবে তাজউদ্দিন সাহেব ডি পি ধরকে এ মর্মে নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে জাতিসংঘে মোশতাককে পাঠানো হবে না। পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার ঢাকায় অবস্থান নিলে মোশতাককে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয় বটে, কিন্তু ছলে-বলে-কৌশলে বঙ্গবন্ধুর কাছে শহীদ তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে বহু মিথ্যা তথ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কান ভারি করে অবশেষে মন্ত্রীত্ব ফিরে পান মোশতাক। এদিকে বঙ্গবন্ধুর বিচার বন্ধের জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রনায়ককে অনুরোধ করেন এ বিচার বন্ধে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্টকে বলেন শেখ মুজিবের বিচার হলে তা এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। ইয়াহিয়া বলেছিলেন ঢাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের পরাজিত করা হলে শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝুলানোই হবে তার প্রথম কাজ।

৪ ডিসেম্বর মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করে, তবে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ট্রাইব্যুনালের একমাত্র বেসামরিক সদস্য একজন জেলা জজ অনুপস্থিত থাকেন। অক্টোবর মাসে মার্কিন সিনেটের প্রভাবশালী সদস্য এডওয়ার্ড কেনেডি ভারত গমন করে বাংলাদেশের ঘটনাকে বর্তমান সময়ের জঘন্যতম দুর্যোগ বলে আখ্যায়িত করে বলেন, শেখ মুজিবের বিচার শুধু এ কারণে করা হচ্ছে যে তিনি নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। মোশতাক গংদের সব পরিকল্পনার গুড়ে বালি দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও তারা কূট পরিকল্পনা পরিহার করেনি।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা মোশতাককে কূটচালের শিরোমণি মনে করতেন, এমনকি স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও মোশতাককে কূটচালের নায়ক ভাবতেন। কিন্তু সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র নাখোশ হতে পারে ভেবে বঙ্গবন্ধু মোশতাকের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নেননি, কেননা, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে তখন মার্কিন সহায়তার খুবই প্রয়োজন ছিল। মোশতাক বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতার সুযোগে একদিকে তার কান ভারি করে অন্যদিকে ষড়যন্ত্র চালাতে থাকে মার্কিন, চীন এবং পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের নির্দেশ এবং পরিকল্পনামাফিক। ষড়যন্ত্রের সাথী হিসাবে তার সাথে জড়ো হয়েছিল অতীতে তার পররাষ্ট্র সচিব মাহবুব আলম চাষী, শাহ মোয়াজ্জেম, কে এম ওবায়দুর রহমান, তাহের ঠাকুর, খাদ্য সচিব মোমেন খান, ওই সময়ের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সাবদার প্রমুখ।

আরও জড়ো হয়েছিল সামরিক বাহিনীর উপ-প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান, যে পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময়ে গোপনে চরের ভূমিকা পালন করে এবং প্রকাশ্যে মুজিবনগরে সৃষ্ট সরকারের বিরোধিতা করে ভিন্ন সুরে কথা বলে পাকিস্তানের আস্থা অর্জন করেছিলেন। ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত বুস্টার একাধিকবার বোরখা পরে গোপনে মোশতাকের ঢাকাস্থ বাড়িতে গমন এবং বৈঠক করেন। তাছাড়া বৈঠক হয় কুমিল্লায় বার্ড-এ, দাউদকান্দিতে। মোশতাক তার নিকট আত্মীয় মেজর (বরখাস্ত) রশীদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রে জিয়ার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে, যে কথা ফারুক-রশীদ ব্রিটিশ টেলিভিশনে প্রকাশ্যেই বলেছে। সে বরখাস্তকৃত মেজর ডালিমসহ কয়েকজন পাকিস্তানপন্থী এবং ধর্মান্ধ মধ্যম পর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তাকে বাগে আনতে সক্ষম হয়ে জিয়ার সাথে মিলিত হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার ছক কষে। হত্যার পর জিয়ার ইচ্ছা অনুযায়ীই মোশতাক অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পায়। এর পর জিয়া-মোশতাকের প্রথম পদক্ষেপই হয় সামরিক শাসনকালীন সময়ে বন্দুকধারী খুনিদের রক্ষার জন্য এমন অধ্যাদেশ জারি করা যাতে তাদের বিচারের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে অপরাধীদের বিচার থেকে দায়মুক্তি দেয়ার এ ধরনের নজির ইতিহাসের কোথাও পাওয়া যায় না। ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর সেই কালো অধ্যাদেশটি জারিতে যে জিয়ার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল, তা বহু তথ্য প্রমাণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তাছাড়া ১৯৭৯ সালে জিয়া একক ভূমিকায় ওই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করে একে সংবিধানের অংশে পরিণত করেছিল।

জিয়া-মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যার হুকুমের আসামি ছিল বিধায় বন্দুকধারী খুনিদের রক্ষা করা তাদের নৈতিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছিল বলেই তারা অধ্যাদেশটি করে দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি শুরু করে। তাছাড়া তারা এটাও ধরে নিয়েছিল যে বন্দুকধারীদের বিচার হলে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়া-মোশতাকের ভূমিকার কথাও ফাঁস হয়ে যাবে। ওই তথাকথিত অধ্যাদেশ দ্বারা তাদেরও দায় মুক্তি দেয়ার অপবিধান রাখা হয়েছিল যারা শুধু বন্দুকের জোরেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি বরং ১৫ অগাস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়ন করেছিল। এভাবে মূল পরিকল্পনাকারী জিয়া-মোশতাককেও দায় মুক্তির অপব্যবস্থা করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রায় অর্ধশতাব্দী পার হতে যাচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা রিপোর্ট ছাড় পাওয়ার আগেও আমরা বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়া-মোশতাকের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার কথা জেনেছি, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় পাওয়া সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এবং ফারুক-রশীদের প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে। ইদানিং বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পরে বিষয়টি দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়া-মোশতাকের ভূমিকা সম্পর্কে যে সব সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, ইনডেমনিটি আইনটি তার সাথে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। জিয়া-মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত ছিল বলেই তারা বন্দুকধারী খুনিদের বাঁচানোর জন্য এই আইন করেছিল, নয়তো কেন তারা এ ধরনের একটি নিকৃষ্ট আইন প্রণয়ন করেছিল, যা তাদের অনাদিকাল মানুষের ঘৃণার পাত্রে পরিণত করবে বলে তারা নিশ্চয়ই অবগত ছিলেন।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়