ঢাকা, বুধবার   ০৬ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ২১ ১৪২৯

বন্যার সময় থাকুন সচেতন

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১:৪৫, ২২ জুন ২০২২  

সংগৃহীত

সংগৃহীত

করোনা মহামারির এই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে হচ্ছে বন্যা। অনেক মানুষ এখন পানিবন্দী। দুর্গত মানুষদের জীবনে বন্যা যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে। বন্যা যেমন মানবিক দুর্ভোগের কারণ, তেমনি বয়ে আনে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিও। বন্যার সময় যেমন স্বাস্থ্য সমস্যার ব্যাপারে থাকতে হবে সচেতন, তেমনি আক্রান্ত হলে নিতে হবে সঠিক পরিচর্যা ও চিকিৎসা।

পানিবাহিত রোগ

দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির উৎস বন্যার নোংরা ও দূষিত পানিতে সংক্রমিত হয়ে যায়। তাই ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ এবং হেপাটাইটিস-ই-এর মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে। পেটব্যথা, বমি, পাতলা পায়খানা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্বর বা জন্ডিসের মতো উপসর্গ প্রকাশ পায়। এসব রোগের সংক্রমণ মোকাবিলা করতে রান্না, খাবার এবং থালাবাসন ধোয়ার জন্য বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে হবে।

এ জন্য পানি অবশ্যই বিশুদ্ধ করে নিতে হবে। ফুটিয়ে বিশুদ্ধ করে পরিষ্কার পাত্রে পানি রাখুন। এক ঘণ্টা রেখে দেওয়ার পর পাত্রের ওপরের পানি আরেকটি পরিষ্কার পাত্রে নিয়ে ফুটিয়ে পানের উপযোগী করুন। যদি পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে ব্লিচিং পাউডার, ফিটকিরি বা হ্যালোজেন ট্যাবলেট দিয়েও পানি বিশুদ্ধকরণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে পাঁচ লিটার পানিতে এক কাপের এক-চতুর্থাংশ পরিমাণ ব্লিচিং পাউডার বা ফিটকিরি ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে। আধঘণ্টা অপেক্ষা করার পর তলানি জমলে ওপরের পরিষ্কার পানি ব্যবহার করা যায়। অথবা একটি হ্যালোজেন ট্যাবলেট বা ক্লোরিন বড়ি ২০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৩০ মিনিট অপেক্ষার পর পানি ব্যবহার করতে পারেন।

 আক্রান্ত হলে

ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হলে পরিমাণমতো খাওয়ার স্যালাইন খেতে হবে। ২ বছরের কম বয়সী শিশুকে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ১০-২০ চা-চামচ এবং ২ থেকে ১০ বছরের শিশুকে ২০ থেকে ২৪ চা-চামচ খাওয়ার স্যালাইন মেশানো পানি খাওয়াতে হবে। অন্য বয়সী রোগীরা প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর যতটা পারেন খাওয়ার স্যালাইন পান করবেন। খাওয়ার স্যালাইন না থাকলে বিকল্প হিসেবে এক মুঠো গুড় ও তিন আঙুলের এক চিমটি লবণের সমন্বয়ে বাড়িতে প্রস্তুত করা স্যালাইন খাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ভাতের মাড়, চিড়ার পানি, ডাবের পানি ইত্যাদিও খাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে শিশুকে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল এবং জিংক ট্যাবলেট খাওয়ানো যেতে পারে।

যদি বমি ও পাতলা পায়খানার পরিমাণ খুব বেড়ে যায়, চোখ গর্তে ঢুকে যায়, প্রস্রাব কমে যায়, তাহলে দেরি না করে কাছের হাসপাতালে যোগাযোগ করা উচিত।

কৃমি

বন্যার সময় কৃমির সংক্রমণও বেড়ে যায়। যা বিশেষ করে শিশুদের অপুষ্টি, রক্তশূন্যতার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্য বন্যা উপদ্রুত এলাকায় পরিবারের সবার এক ডোজ কৃমিনাশক বড়ি সেবন করা উচিত। তবে দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের কৃমিনাশক বড়ি খাওয়ানো যাবে না। কৃমি থেকে মুক্ত থাকতে খাবার গ্রহণে সতর্ক হতে হবে। বাসি ও পচা খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। খাবার তৈরি, পরিবেশন ও খাওয়ার আগে, মলমূত্র ত্যাগ ও শিশুদের মলমূত্র পরিষ্কারের পর সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। যেখানে-সেখানে মলত্যাগের ফলে কৃমির সংক্রমণ অনেক বেড়ে যায়। এ জন্য নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানায় মলমূত্র ত্যাগ করা উচিত। পায়খানা ব্যবহারের সময় খালি পায়ে থাকা থেকে বিরত থাকুন এবং স্যান্ডেল ব্যবহার করুন।

চর্মরোগ ও চোখের সমস্যা

বন্যার পানিতে হাঁটা বা নোংরা পানি ত্বকে লাগানো স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। বন্যার পানিতে গোসল করা, কাপড়চোপড় ধোয়া, থালাবাসন পরিষ্কার করা একদমই অনুচিত। শিশু-কিশোরেরা যেন বন্যার পানি থেকে দূরে থাকে এবং বন্যার পানিতে খেলাধুলা না করে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কেননা, বন্যার পানি ত্বকে লেগে খোসপাঁচড়া, দাঁদ ইত্যাদি ছত্রাকজনিত ও অন্যান্য চর্মরোগ কিংবা চক্ষুরোগ হতে পারে। চর্মরোগ দেখা দিলে টেলিমেডিসিনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বন্যার সময় ও পরে অনেকেই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণজনিত চোখ ওঠাজাতীয় চক্ষুরোগে আক্রান্ত হন। চোখ উঠলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো নির্দিষ্ট সময় ব্যবধানে চোখে অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ ব্যবহার করতে হবে। চোখের কোনো ড্রপ একবার ব্যবহার করলে তা ওই রোগী ছাড়া অন্য কেউ আর ব্যবহার করবেন না। নোংরা-ময়লা পানি দিয়ে চোখ পরিষ্কার ও চোখ ডলা থেকে বিরত থাকুন। ঘুমানোর সময় যে পাশের চোখ আক্রান্ত হয়েছে, সেই কাত হয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করবেন।

 সাপে কাটা

বন্যাদুর্গত এলাকায় সাপের উপদ্রব বেশ দেখা যায়। নির্বিষ সাপে কাটলে ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু বিষধর সাপে কাটলে রোগীকে বাড়িতে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। যদি সাপে কাটা স্থানে একটি বা দুটি ক্ষতচিহ্ন দেখা যায় এবং সেই সঙ্গে সাপে কাটা স্থানে তীব্র ব্যথা বা জ্বালা করে, কাটা স্থানটি ফুলে লাল হয়ে যায় ও রক্তক্ষরণ হতে থাকে, ঘুমঘুম ভাব, মাথাব্যথা বা মাথা ঝিমঝিম করে, বমি বমি ভাব বা রক্ত বমি হয়, দুর্বলতা, দৃষ্টিভ্রম ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, তাহলে বুঝতে হবে বিষধর সাপে কেটেছে। এ ক্ষেত্রে রোগীকে আশ্বস্ত করে শুইয়ে দিয়ে যে অঙ্গে সাপ দংশন করেছে, তা সম্পূর্ণ স্থির রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। হাতে-পায়ে দংশনের ক্ষেত্রে একটি মোটা কাপড় বা গামছা দিয়ে দংশিত স্থানের ওপরে যেন খুব শক্ত না হয়, এমনভাবে গিঁট দিন। দংশিত স্থানের আশপাশে কাটাকাটি করা, সুই ফোটানো, রক্ত চুষে বের করা, গাছপালার রস বা গোবর লাগানো অনুচিত। সাপকে দূরে রাখতে কার্বলিক অ্যাসিড বোতলের মুখ খুলে ঘরে রাখতে পারেন। তবে অবশ্যই তা শিশুদের নাগালের বাইরে রাখবেন। 

কী প্রস্তুতি নেবেন?

বন্যার সময় শুকনা খাবার, চিড়া, মুড়ি, খই, বিস্কুট, দেশলাই, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ওরস্যালাইনের প্যাকেট, মশার কয়েল প্রভৃতি সংরক্ষণ করুন এবং দলিল, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস পলিথিনে মুড়িয়ে রাখুন। গর্ভবতী, শিশু ও বৃদ্ধদের উঁচু স্থানে রাখার ব্যবস্থা করুন। ঘুমানোর সময় শিশুকে খাটের এক কোনায় না রেখে খাটের মাঝখানে ঘুম পাড়ান। নলকূপের মুখ পলিথিন দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিন। বন্যার পানি নেমে যাওয়া

সর্বশেষ
জনপ্রিয়