ঢাকা, বুধবার   ০৬ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ২১ ১৪২৯

সংগ্রাম ও উন্নয়নে আওয়ামী লীগ

তোফায়েল আহমেদ

প্রকাশিত: ১৫:১৯, ২৩ জুন ২০২২  

তোফায়েল আহমেদ

তোফায়েল আহমেদ

মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শামসুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতারা দলের আত্মপ্রকাশের দিন হিসেবে ইতিহাস থেকে ২৩ জুন (১৯৪৯) তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন। কারণ, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্য অস্তমিত হয়েছিল।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বঙ্গবন্ধু হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন, 'এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয় নাই। একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে।' গণবিচ্ছিন্ন নেতৃত্বের স্থলে জনসম্পৃক্ত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে '৪৭-এর শেষে বঙ্গবন্ধু সতীর্থ-সহযোদ্ধাদের নিয়ে ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে 'ওয়ার্কার্স ক্যাম্প' সংগঠিত করেন ও '৪৮-এর ৪ জানুয়ারি 'ছাত্রলীগ' প্রতিষ্ঠা করেন।

ঢাকার রোজ গার্ডেনে আওয়ামী লীগের জন্মকালে বঙ্গবন্ধু কারারুদ্ধ ছিলেন এবং পরে এ সম্পর্কে 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন; তার নাম দেওয়া হল 'আওয়ামী মুসলিম লীগ'। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, জনাব শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং আমাকে করা হল জয়েন্ট সেক্রেটারি। খবরের কাগজে দেখলাম, আমার নামের পাশে লেখা আছে 'নিরাপত্তা বন্দী'। বস্তুত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মহান ভাষা আন্দোলন ও মহত্তর মুক্তিযুদ্ধের বীজ রোপিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ নামগুলো তাই সমার্থক হয়ে আছে।

১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে বঙ্গবন্ধু বাণিজ্য, শ্রম ও শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। কিন্তু ১৯৫৭ সালের ৮ আগস্ট মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করে তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তাঁর কাছে দলের দায়িত্ব মন্ত্রিত্বের ক্ষমতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর মধ্যরাতে জেনারেল আইয়ুব খান রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রাজনীতি নিষিদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুসহ রাজনীতিকদের কারাগারে নিক্ষেপ করেন। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অনুষ্ঠিত সভায় আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু পুনরায় দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু আমাদের বলতেন, 'সাঁকো দিলাম, এই সাঁকো দিয়েই একদিন আমরা স্বাধীনতায় পৌঁছাবো।' তার পরের ইতিহাস সবারই জানা। 

১৯৬৯ সালে প্রবল গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে ২২ ফেব্রুয়ারি জাতির পিতাকে ফাঁসিকাষ্ঠ থেকে মুক্ত করে ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ১০ লক্ষাধিক বাঙালির জনসমুদ্রে কৃতজ্ঞ জাতি 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করে। এর কিছুদিন পরে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ '৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে ষড়যন্ত্র শুরু করে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী। এর ফলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হাতিয়ার তুলে নিয়ে ৩০ লক্ষাধিক শহীদ আর ২ লক্ষাধিক মা-বোনের আত্মত্যাগে বাংলাদেশ স্বাধীন করে।

১৯৭২ সালের ৭-৮ এপ্রিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বর্ণাঢ্য কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু পুনরায় সভাপতি ও জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু যে মুহূর্তে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে স্বাভাবিক করেন; অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি দেন, ঠিক তখনই ঘাতকের নির্মম বুলেটে একাত্তরের পরাজিত শক্তি, বাংলার মীরজাফর, বেইমানরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। ওই সময় তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রবাসে থাকায় ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পান।

ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি। আজ বিনম্র শ্রদ্ধায় জাতির পিতাকে স্মরণ করে এ কথাই মনে করি, সারাটি জীবন তিনি জেল-জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতন সবই সহ্য করে আওয়ামী লীগকে গড়ে তোলেন দেশ স্বাধীন করার জন্য। দলের কর্মীদের তিনি পরিবারের সদস্য মনে করতেন। দক্ষতা, সাহস, সীমাহীন ত্যাগ, অসীম ধৈর্য আর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে খুনি চক্র মনে করেছিল, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশের মাটি স্পর্শ করে শহীদের রক্তে ভেজা আওয়ামী লীগের পতাকা হাতে তুলে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ তথা অর্থনৈতিক মুক্তির দায়িত্বভার গ্রহণ করে বাংলাদেশকে আজ অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করেছেন। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ চতুর্থবারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত। জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বাংলাদেশকে বিশ্বে মর্যাদার আসনে আসীন করেছেন।

শেখ হাসিনা যা বিশ্বাস করেন, জাতির পিতার মতো তা-ই তিনি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও পদ্মা সেতু নির্মাণ তার অদম্য প্রমাণ। বিশ্বব্যাংক রক্তচক্ষু প্রদর্শন করে কায়েমি স্বার্থবাদী ষড়যন্ত্রকারীদের দিয়ে তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদ্মা সেতু নির্মাণ বাধাগ্রস্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সততা ও অদম্য ইচ্ছার ফলে সে বাধা অপসারিত হয়েছে এবং পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান। ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হবে। আমি মনে করি, শুধু দক্ষিণাঞ্চলের না; সমগ্র বাংলাদেশের অথনৈতিক উন্নয়নে পদ্মা সেতু গতি আনবে।

জাতির পিতা দুটি লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করেছেন। একটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আরেকটি অর্থনৈতিক মুক্তি। তিনি আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছেন, কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। সেই কাজটি নিষ্ঠা, দক্ষতা ও সততার সঙ্গে করে চলেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন সব ধরনের প্রতিকূলতা জয় করে স্বাধীন বাংলাদেশ হবে মর্যাদাশালী, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা।

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়